৫ম প্রজন্মের প্রযুক্তি বিশ্বের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে ৩ মার্চ স্পেনের বার্সেলোনায় পর্দা নেমেছে বিশ্বপ্রযুক্তির সবচেয়ে বড় আয়োজন ‘ওয়ার্ল্ড মোবাইল কংগ্রেস (এমডব্লিউসি)’। নতুন প্রযুক্তির চমক অর্থাৎ সর্বশেষ ডিভাইস, গ্যাজেট, প্রযুক্তি, ইভেন্ট এবং শিল্পের প্রবণতা কোন দিকে যাচ্ছে তা পরখ করে দেখার সুযোগ করে দেয় বিশ্বের এই অনন্য প্রযুক্তি মেলা। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় ফিরা গ্রান ভায়ায় মিলেছে ৫জি থেকে শুরু করে ইন্টারনেট অব থিংকস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, এজ কম্পিউটিং এবং সর্বোপরি প্রযুক্তির পরাবস্তাকে স্পর্শের অনুভূতি। বিজ্ঞান-কল্পকাহিনীর বাস্তবতায় অবগাহনে সুযোগ করে দেয় দর্শনার্থীদের।
করোনার ছেদ কাটিয়ে কংগ্রেস শুরুর প্রথম দিনই বরাবরের মতো এবারের কংগ্রেসে যোগ দিয়েছেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার। বাংলাদেশ থেকে কংগ্রেসে যোগ দেয়া প্রতিনিধি দলে তার সঙ্গে ছিলেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সচিব মোঃ খলিলুর রহমান, বিটিআরসি চেয়ারম্যান শ্যাম সুন্দর সিকদার, টেলিযোগাযোগ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রকৌশলী মশিউর রহমান, বিটিসিএল ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মো. রফিকুল মতিন, টেলিটক ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মোঃ সাহাব উদ্দিন, বিটিআরসি পরিচালক এম এ তালেব হোসেন, আএসপিএবি সভাপতি ইমদাদুল হক ছাড়াও এই খাতের অনেক শীর্ষ ব্যবসায়ী ও অনুরাগীরা গিয়েছিলেন এবারের মেলায়।
মেলার শেষ দিন দেশে ফেরার আগ মুহূর্তে ‘কানেক্টিভিটি আনলেশড’ নিয়ে এবারের কংগ্রেস নিয়ে ডিজিবাংলা’র সঙ্গে নিজের টাটকা অনুভূতির কথা জানিয়েছেন টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী। সম্মেলন স্থল থেকে কথা বলার সময় প্রবীণ বয়সের ক্লান্তির কোন ছাপই ছিলো না মোস্তাফা জব্বারের কণ্ঠে। ঘুরে ফিরে বারবারই কংগ্রেসের প্রতিটি বিষয়ের সঙ্গে ডিজিটাল বাংলাদেশ রূপকল্প নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছিলেন তিনি।
টুকরো টুকরো অভিজ্ঞতা মেলে ধরে বললেন, এটাকে মোবাইল কংগ্রেস বলা হলেও আমার কাছে বিশ্বে প্রযুক্তি নিয়ে এর চেয়ে বড়, ব্যাপক ও কার্যকর কোনো মেলা আছে বলে মনে হয় না। এটা বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম মেলা। মেলায় প্রবেশ করেই বুঝলাম, এ যেনো ৫জি’র বসন্ত। বিশ্ব কীভাবে ৫জি’র যুগে প্রবেশ করছে তার বাস্তব রূপ এবং ভবিষ্যতের দেখা পেলাম এখানে। অনেক কিছুই তাই মুহূর্তে সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করেছি। অনেক কিছুই করতে পারিনি। তবে সব মিলিয়ে বলতে পারি, ৫জি নিয়ে আমরা ঠিক পথেই আছি। পশ্চাদ পদতায় নেই। বরং পশ্চিমা উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে সমান তালেই চলছি আমরা।
আগামীতে ৪জি এবং ৫জি কিভাবে একই সঙ্গে হাতে হাত ধরে চলবে সে জন্য ডেভলাপদের নানা উদ্ভাবন ও প্লাটফর্মের সঙ্গে পরিচয় হওয়ার কথা তুলে ধরেন প্রযুক্তিপ্রাণ মোস্তাফা জব্বার। জানালেন, কীভাবে ভার্চুয়াল অ্যাসিস্টেন্ট তাকে গাইড করার পাশাপাশি তাকে মুগ্ধ করেছে- ‘তার সম্মোহনী ও আমাকে বোঝার ক্ষমতা ছিলো অসাধারণ। কখনো মনেই হয়নি আমি এখানে একা। আর মেটা ভার্স বা পরাবাস্তবতা তো ধরা দিলো বাস্তবেই!’
মোস্তাফা জব্বারের বয়ানে আরো জানা গেলো, ২৭ ফেব্রুয়ারি বার্সেলোনায় পৌঁছে হলুদ রঙের ‘ডাকবাক্স’ তার মনকে বেশ নাড়া দিয়েছে। সম্মেলনে হুয়াওয়ে ও চায়না মোবাইলের আয়োজনে উপস্থাপিত হয়ে তিনি বুঝতে পেরেছেন ক্লাউড কোর নেটওয়ার্কে ৪জি ও ৫জি’র পূর্ণ-অভিন্নতা বা কেন্দ্রমুখীতার বিষয়টি। এই নেটওয়ার্কটি কীভাবে ডিজিটাল অর্থনীতিকে চাঙ্গা করবে, সঙ্গে সামাজিক মূল্যবোধকেও সজীব রাখবে তারও সাক্ষাৎ ঘটেছে এখান থেকেই। সবাই মিলে একসঙ্গে ৫জি বিশ্বে দৃঢ় অবস্থানে ডিজিটাল ইন্টিলিজেন্স এর ভূমিকাও মনের নতুন খোরাকের জন্ম দিয়েছে। ওই দিনই বাংলাদেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করে জিএসএমএ কর্তৃপক্ষ। বৈঠকে জিএসএমএ মহাসচিব ম্যাটস গ্র্যানরিড, চিফ ফিন্যান্সিয়াল অফিসার লুইস ইস্টারব্রুক ছাড়াও শীর্ষ ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। এসময় প্রত্যেককেই বঙ্গবন্ধুর ওপর লেখা একটি স্মৃতি গ্রন্থ সবাইকে উপকার দেন মন্ত্রী।

এরপর যোগ দেন আইটিইউ আয়োজিত মন্ত্রীসভা বৈঠকে। কোয়ালকমের পৃষ্ঠাপোষকতায় এই সভায় জানানো হয়, কোভিডে ২০২১ সালে বিশ্বের ৬৩ শতাংশ মানুষই সংযুক্ত ছিলো ইন্টারনেটে। এরইমধ্যে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৮৮ শতাংশ এলাকাতেই পৌঁছে গেছে ৪জি। আর ২০৩০ সাল নাগাদ বিশ্ব অর্থনীতিতে ৯৬১ বিলিয়ন ডলারের বাজার সৃষ্টি করবে ৫জি।
তবে এই ঘোর কাটতে না কাটতেই ইন্টারনেট কর্পোরেশন ফর অ্যাসাইনড নেমস অ্যান্ড নাম্বারস (আইকান) সভাপতি গোরান মারবি যখন বিজয় বাংলা নিয়ে আলাপ শুরু করেন তখন নতুন বিস্ময়ের মুখোমুখি হন এর জনক মোস্তাফা জব্বার। ১ মার্চ দিনটা শুরু করেন বিশ্ব মোবাইল কংগ্রেসে পেশাদারি ভিডিওর কাজ অবলোকনের মাধ্যমে। ৫জি নেটওয়ার্কে রোবটগুলো কীভাবে দক্ষ কর্মীর মতো কাজ করে তার সাক্ষী হন বিভিন্ন স্টলে। কৃত্রিম রুম হিটার, নান্দনিক ও আর প্রখর বুদ্ধিমত্তার রোবট, ৫জি প্রযুক্তির স্বয়ংক্রিয় টার্মিনালে কীভাবে কারখানার কাজ গুলো নিজে থেকেই সম্পাদিত হচ্ছে তা ঘুরে ঘুরে দেখেন বাংলাদেশের প্রতিনিধি দল নিয়ে। পরখ করে দেখেন মেটা ভার্স। অগমেন্টে রিয়েলিটির জাদু। পরদিন চুটিয়ে আড্ডা দেন আন্তর্জাতিক টেলিকমিউনিকেশন্স উইউনিয়নের (আইটিইউ) মহাসচিব হাওলিন ঝাও এর সঙ্গে। চীনা এ নাগরিকের পাশাপাশি বাহরাইনের পরিবহন এবং টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী কামাল বিন আহমেদকে বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীর ইংরেজি সংস্করণ উপহার দেন। কয়ল খনিতে ঝুঁকি পূর্ণ কাজে রোবট পরিচালনায় ৫জি সংযোগ কাজে লাগানো, অ্যাকুরিয়াম গুলোর মাছগুলোকে কীভাবে খাদ্য দেয়া ও চিকিৎসা করা হয়- জীবন যাপনের প্রতিটি স্তরেই ৫জি কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে তার অবলোকন করেন।
সমাপনী দিনে দ্বিতীয় দফায় গিগা গ্রিন সাইটে ৫জির কৃষি প্রযুক্তিসহ জীবনের পরতে পরতে এই অভ্যূদ্বয়ের নেটওয়ার্ককে নিজেদের জীবনে প্রয়োগের অংক কষতে কষতে দেশের পথে রওনা দিয়েছে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দল। শনিবার নাগাদ দেশে ফিরবে দলটি।